এই পৃষ্ঠার অধিকাংশ তথ্য পরিবেশগত বহিষ্কার থেকে নেওয়া হয়েছে (নরমান মায়ার্স, জলবায়ু সংস্থা ১৯৯৫)।
জলবায়ু সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী পরিবেশগত উদ্বাস্তু তারাই যারা পরিবেশগত সংকটের সময় পালায়, সে সংকট স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদী, প্রাকৃতিক বা নৃবিজ্ঞান জনিত হতে পারে। পরিবেশের অবনতির জন্য জীবিকা অর্জনে অক্ষমতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, উন্নতিমূলক প্রকল্পের জন্য উদ্বাস্তুদের পিতৃভূমি থেকে সরে যেতে হয়। অপসারণের কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ভূমির অবনতি, খরা, বনসংহার, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং অন্য পরিবেশগত পরিবর্তন; যেগুলির দারিদ্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে। বর্তমান বিশ্বে ২.৫ থেকে ৩ কোটি পরিবেশগত উদ্বাস্তু আছে; প্রধানত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এ সংখ্যাটা বেড়ে শতকের মাঝামাঝি ২০ কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। প্রথাগত উদ্বাস্তুদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যে পরিবেশগত উদ্বাস্তুরা জেনেভা কন্ভেন্সান বা জাতিপুঞ্জের উদ্বাস্তুদের উচ্চ কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত নয় সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তাদের সমান আইনগত অবস্থান নেই।
বর্তমানে বৃহত্তম সংখ্যার পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের বাসস্হান সাহারাসংলগ্ন আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। পরিবেশগত টানাপড়ার জটিলতা ও অপর্যাপ্ত সাম্প্রতিক গবেষনার কারণে পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের সঠিক হিসেব রাখা শক্ত। ১৯৯৫ সালে জলবায়ু সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত সর্বাধুনিক ও সম্পুর্ন গবেষনাপত্র মোতাবেক বিশ্বব্যাপী ২.৫ কোটি পরিবেশগত উদ্বাস্তু চিন্হিত হয়েছে। এই গবেষণাপত্রের প্রকাশক নরমান মায়ার্স পরবর্তীকালে এই সংখ্যাটিকে বাড়িয়ে ২.৫-৩ এর মধ্যে রেখেছেন। ১৯৯৫ সালের এই ২.৫ কোটি উদ্বাস্তুর মধ্যে ৫০ লক্ষ আফ্রিকার সাহেলের খরার হাত থেকে পালিয়েছে (সেনেগাল এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে বিস্তৃত প্রায় উষর তৃণভূমি ও সমভূমি); ৪০ লক্ষ উদ্বাস্তু আফ্রিকার হর্নে ; কমপক্ষে আরও ৭০ লক্ষ উদ্বাস্তু দুর্ভিক্ষপীড়িত সাহারার উপকন্ঠের আফ্রিকায় ; চীনের অন্যুন ৬০ লক্ষ পরিবেশগত উদ্বাস্তু জমির ঘাটতির কারণে (দেশের মোট ১২০ লক্ষ উদ্বাস্তুর মধ্যে); মেক্সিকোয় কমপক্ষে ২০ লক্ষ মানুষ পরিবেশগত অবক্ষয়ের থেকে পালিয়েছেন; চীন এবং ভারতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ জন প্রকল্পের কাজের জন্য উদ্বাস্তু, এদের মধ্যে দশ লক্ষের পুনর্বাসন এখনো হয় নি। অন্য যে জায়গাগুলিতে বেশী সংখ্যায় পরিবেশগত উদ্বাস্তু আছে সে গুলি হল এল সালভাদর ও কেনিয়া।
আরও উদ্বেগের কারণ গবেষনাপত্রটি নির্দেশ করেছে যে অনেক অধিক সংখ্যার মানুষ যারা প্রতিকুল পরিবেশ অবস্থার, দারিদ্রের, জনসংখ্যার চাপের সম্মুখীন, তারা পরিবেশগত উদ্বাস্তু হবার বিপদের মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সাহারার উপকন্ঠের ১৫ কোটি মানুষ যারা খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি, ১৩.৫ কোটি মানুষ যারা ভীষন মরুকরণের দরুণ ক্ষতিগ্রস্ত, জলাভাবে আক্রান্ত ৫.৫ কোটি মানুষ, ২.৫ কোটি কৃষক যারা প্রান্তীয় পর্বত গাত্রিয় ক্ষেত্রে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ অনুল্লিখিত চাষী যারা প্রথাগত কৃষিজমি ফেলে উষ্ণ বনাঞ্চলে সরে গেছে।
পরিবেশগত উদ্বাস্তু বলতে বোঝায় এমন সব মানুষ যারা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত অবনতি, স্বল্প মেয়াদী ঘটনা সমূহ বা উন্নতিমূলক প্রকল্পগুলির জন্য বাসভূমি থেকে উৎখাত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী রাশিগুলির বিক্রিয়ার ফলে লাগাতার কৃষি নির্ভরশীলতা কঠিন কিম্বা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভূমির অবনতির কারনগুলির মধ্যে রয়েছে লবনাক্ত করণ (লবনাক্ত জল ঢোকার ফলে উর্বর কৃষিজমি বিষাক্ত হয়ে পড়ে), জল জমা, ভূমিক্ষয়, পুষ্ট্কারীর অভাব এবং জীববৈচিত্রের বিলোপ। জমির শ্রেণীবিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ন প্রকার হল মরুকরণ যা শুষ্ক ভূমির পারিবেশ্চক্রে জলবায়ু পরিবর্তন, (বিশেষ করে খরার জন্য) এবং অসহনীয় মনুষ্যকর্মের যেমন অতিরিক্ত চাষ, অতিরিক্ত পশুপালন বা বনছেদনের ফলে ঘটে। সাহারার উপকন্ঠের আফ্রিকায় দারুন মরুকরণ ১৯৯৫ সালে ১০ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। মাযার্সের মতে মরুকরণের জন্য গোটা পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৬০০০০ বর্গ কিলোমিটার উর্বর কৃষিজমি লুপ্ত হচ্ছে এবং জল জমা ও লবনাক্ত করনের জন্য সেচযোগ্য জমির ১ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। জল দুষণ খরা এবং মিষ্ট জলের হ্রাসের দরুন জলের ঘাটতি মরুকরণ এবং শস্য উৎপাদন হ্রাসের কারণগুলির অন্যতম। এর ফলে কৃষকরা প্রথাগত জমি থেকে সরে যায় এবং অবশিষ্ট কৃষিজমির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যারা থেকে যায় তারা দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়।
পরিবেশগত সরণ ঘটাতে সক্ষম এমন স্বল্পমেয়াদী ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলি যেমন হ্যারিকেন, ভূমিকম্প এবং বন্যা। রেডক্রসের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অনুমান করেছেন যে ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতি বছর গড়ে ২১ কোটি মানুষ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ২০০৪ সালের সুনামি এশিয়াতে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষকে অপসারিত করেছিল যারা অনেকেই উদ্বাস্তু শিবিরে রয়েছেন; ১৯৯৫ সালের হ্যারিকেন ক্যাট্রিনা ১৫ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে যার মধ্যে ৩৩০০০০ মানুষ আর কখনই নিজের ঘরে ফিরতে পারবেন না। পরিবেশগত দুর্ঘটনার শিকারদের যেমন চেরনোবিল দুর্ঘটনা বা ভূপাল গ্যাসকান্ডের শিকারদেরও পরিবেশগত উদ্বাস্তু হিসাবে গন্য করা যায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতি বছর প্রায় এক কোটি মানুষ যাদের ঘর নানাপ্রকার উন্নতি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁধ, সেচ্ খাল, নাগরিক নির্মান প্রভৃতি প্রকল্প গুলি প্রতি বছর এক বিপুল জনসংখ্যাকে সরে যেতে বাধ্য করে। ভারতের বাঁধ প্রকল্পগুলি বৃহত্তম জনসংখ্যাকে অপসারিত করেছে যা অনুমানিত প্রায় ৩.৩ কোটি।
দারিদ্র্য ব্যাধি দুর্ভিক্ষ এবং জনসংখ্যার চাপ বর্তমান পরিবেশগত সমস্যাগুলিকে আরও জটিল করে তোলে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপ্রবন জনগণ যারা কৃষি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর জীবনধারণের জন্য নির্ভরশীল প্রায়শই পর্বতগাত্রের সংকীর্ণ জমিতে বা তার মধ্যেই নিম্নমানের জমিতে বসবাস করে এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে খাদ্য যোগাতে এই ভূমির মান আরও নিম্নমুখী হয়। হিমালয় অঞ্চলে অপসারিত কৃষকরা অসহনীয় "কাট এবং জ্বালাও" কৃষি পদ্ধতি অবলম্বন করে যা বনাঞ্চল হ্রাস করে খরার প্রকোপ বাড়ায় এবং ফসল উৎপাদন কমায়। জলের ঘাটতি এবং দূষণ ও ক্ষতিকারক হতে পারে, কারণ উন্নতিশীল দেশগুলিতে পরিশ্রুত জলের অভাব ৯০ শতাংশ রোগের জন্য দায়ী। উপরন্তু পরিবেশ অবনতি বা অন্য কারণে অপসারিত মানুষ প্রায়ই সেইসব বিপজ্জনক নাগরিক আবাসনে স্থানান্তরিত হয় যা অতি উচ্চ মাত্রায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবন।
অধিকাংশ না হলেও অনেকগুলি স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ঘটনা মনুষ্যজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তীব্রতর হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলির সংখ্যা এবং মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে গিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফল যেমন কিছু অঞ্চলে উষ্ণতর তাপমাত্রা, খরা, অন্য জলবায়ু অস্বাভাবিকতা, সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি দুর্ভিক্ষবৃদ্ধির কারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী ভূমির অবনতির কারণ গুলির সঙ্গে বিক্রিয়া করে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বাস্তু বিষয়ক উচ্চ কমিশনের (UNHCR) সংজ্ঞা অনুযায়ী উদ্বাস্তু বলতে বোঝায় আইনি বিচারের, যুদ্ধের বা গৃহ বিবাদের ফলে যারা দেশ ছেড়ে এসেছে তাদেরই। উদ্বাস্তু অবস্থায় এক জন মানুষের অধিকার অন্য দেশে নিরাপদ আশ্রয় বা তা সম্ভব না হলে অন্য রকম সাহায্যের ব্যবস্থা "যেমন আর্থিক সাহায্য, খাদ্য, যন্ত্র,আশ্রয় বিদ্যালয় ও চিকিৎসালয়ের ব্যবস্থা ইত্যাদি। "UNHCR অতি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ ভাবে অপসারিত (IDP) মানুষদের স্বীকৃতি দিয়েছে: মানুষ যারা রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে ছিন্নমূল হয়েছে কিন্তু নিজের দেশেই রয়েছে। এরা কমিশনের জনাদেশের আওতায় পড়ে না কিন্তু তবুও সাহায্য ও নিরাপত্তা পেতে পারে।
জেনেভা কনভেনশন বা UNHCR কেউই পরিবেশগত অপসারিতদের উদ্বাস্তু আখ্যা দিতে রাজি নয়। UNHCR নিজেই যুক্তি দেখিয়েছে যে প্রথাগত উদ্বাস্তুদের বা IDP দের ব্যতিক্রমে পরিবেশগত কারণে অপসারিত মানুষরা নিজেদের সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাতে পারে সুতরাং তারা আন্তর্জাতিক সংস্থার আওতায় আসে না। উপরন্তু পরিবেশগত উদ্বাস্তদের স্বীকৃতি UNHCR এর ইতিমধ্যেই সংকুচিত বার্ষিক ১০ কোটি ডলারের বাজেটকে আরও অসংকুলিত করবে কারণ এর আওতায় তখন দ্বিগুন সংখ্যক মানুষ আসবে। অনেকে এই কারণে ভীত যে প্রসারিত সংজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বাস্তুতে ছেয়ে যাবে যার ফলে সাহায্য ও সাড়া দেওয়ার চেষ্টা ব্যাহত হবে, এবং আশ্রয়্দানকারী দেশগুলির, যারা ইতিমধ্যেই অভিবাসন কম করতে সচেষ্ট হয়েছে, ওপর চাপ বাড়াবে।
পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার আরেকটি বড় বাধা হল পরিবেশগত উদ্বাস্তু সম্পর্কে একটি সঠিক সংজ্ঞা নির্ণয়ানের দুরুহতা। UNHCR পরিবেশগত উদ্বাস্তু ও অর্থনৈতিক কারণে অপসারিতদের মধ্যে একটি সতর্ক গন্ডি টেনেছেন, পরে উল্লিখিত মানুষরা অধিকতর অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় নিজ দেশ ছেড়ে এসেছে কিন্তু তারা কোন প্রকার বিচারের ভয় ছাড়াই দেশে ফিরে যেতে সক্ষম। সাহায্যকারী দেশগুলি এই ভেবে আশঙ্কিত যে যদি বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক কারণে অপসারিতদের উদ্বাস্তু আখ্যা দেওয়া হয় তাহলে আশ্রয়প্রার্থীদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাবে। পরিবেশগত রাশিগুলি অর্থনৈতিক রাশিগুলির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, যদিও; মেয়ার যাদের পরিবেশগত উদ্বাস্তু আখ্যা দিয়েছেন অভিবাসনের পক্ষে অনুকুল অর্থনৈতিক পরিবেশ তাদের আকাঙ্খিত কারণ সেই অনুকুলতা তাদের অবিতর্কিতভাবে অসহনীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অপেক্ষা ভাল। 'পরিবেশগত উদ্বাস্তু: একটি স্বীকৃতির বিষয় ' এ আন্দ্রু সিমস এবং মলি কনিস্বি বিতর্ক উত্থাপন করেছেন যে পরিবেশগত কারণে পলায়মনরা বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নিজ সরকারের কাছে সুরক্ষা চাইতে পারে না। পৃথিবীর অধিকাংশ পরিবেশগত উদ্বাস্তুরা দুর্বল কিম্বা ব্যর্থ দেশে বাস করে, এই দেশগুলির সাহায্যপ্রার্থীদের সাহায্য করার বা পুনর্বাসন দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিছু রাষ্ট্র উন্নতির কারণে অপসারিত উদ্বাস্তুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে বা এর মূলে থাকে।
ইহা লক্ষনীয় যে রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ কর্মসূচিতে পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে এবং এই বিষয়টিকে বিশ্বের নজরে আনতে একটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা নিয়েছে। যদিও পরিবেশগত উদ্বাস্তু শব্দটি আন্তর্জাতিক শব্দমালায় প্রবেশ করেছে কিন্তু এর সংজ্ঞার ব্যাপারে কোন ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয় নি যাকে নরমান মায়ার্স ১৯৯৫ সালে "বিশ্বের আঙ্গিনায় একটি উদীয়মান সংকট" বলে অভিহিত করেছেন।
এই শতকে মনুষ্যকৃত জলবায়ু পরিবর্তন অনিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিবেশগত উদ্বাস্তু সংকট সৃষ্টি করবে বলে আশংকা আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মরুকরণ, খরা, সমুদ্রের মাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া ঘটনাগুলি বেড়ে যাবে যার ভয়াবহ এবং অপ্রত্যাশিত প্রভাব মনুষ্য সমাজে পড়বে। সর্বাপেক্ষা বিপদের সম্মুখীন উন্নতিশীল বিশ্বের মানুষরা, বিশেষ করে যারা নিচু উন্নতিশীল দেশগুলিতে, ছোট দ্বীপগুলিতে বা উত্তর আফ্রিকার দেশগুলিতে থাকে- যাদের জলবায়ু বৈচিত্রের সঙ্গে খাপ খাওয়ার ক্ষমতা সব থেকে কম। বিশ্বসংস্থার জেফ্রি সাক্স এই বলে সতর্ক করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটের বৃহত্তম বোঝা চার প্রকার ভৌগলিক অঞ্চলের ওপর পড়বে। এগুলি হল নিচু তটভূমি সংলগ্ন আবাসস্থল, হিমবাহ বা তুষারগলা জলে পুষ্ট নদী নির্ভর কৃষিঅঞ্চল, উপ আর্দ্র বা শুষ্কঅঞ্চল যা খরাপ্রবণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলি যারা বর্ষার নকশা পরিবর্তনের মুখোমুখি।
অনেক প্রক্ষেপিত জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সরাসরি জল নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। খরা ও হিমবাহের অবলুপ্তি জলাভাবের সৃষ্টি করবে যার ভয়ংকর প্রভাব নিম্ন অক্ষাংশের ওপর পড়বে যেখানে বর্ধিত তাপমাত্রা দ্রুত ভূমির জলীয়বাষ্প শোষণ করে নেবে। যে নিচু দেশগুলি যারা সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য বন্যায় ভোগে সেখানে নোনা জলের প্লাবনের ফলে কৃষিজমির ও পানীয়জলের বিষাক্ত হওয়ার সম্ভবনা আছে। মায়ার্স অনুমান করেছেন যে ২০২৫ সালের মধ্যে জলাভাবে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ থেকে ৩৩ কোটির মধ্যে থাকবে। লেস্টার ব্রাউন অনুমান করেছেন যে পৃথিবীর জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ কোটি বৃদ্ধি পাবে "এর অধিকাংশ মানুষ থাকবে সে সব দেশে যেখানে জলস্তর ইতিমধ্যেই নিম্নমুখী।"
আশঙ্কা করা যায় যে জলাভাবের জন্য এবং জনসংখ্যার চাপে মরুকরন, যা পরিবেশগত উদ্বাস্তুর প্রধান কারণ, আরও তীব্রতর হবে। বর্তমানে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ সে সব অঞ্চলে বাস করেন যেখানে মরুকরণের শঙ্কা রয়েছে। উত্তর আফ্রিকা, মরক্কো, তিউনিশিয়া ও লিবিয়ায় ১০০০ বর্গ কিলোমিটার জমি কৃষির অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। ভূমিক্ষয়ের জন্য টার্কির ১৬০০০০ বর্গ কিলোমিটার কৃষিজমি প্রভাবিত হয়েছে। বন্যা এবং সমুদ্রতল বৃদ্ধির জন্য লাবনাক্ত্করণ নিচু তটভূমিঅঞ্চলে, যেখানে পৃথিবীর ১০ শতাংশ মানুষ বাস করে, দুর্গতির কারণ হয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রবল ব্লিচিং ও অম্লকরনের মাধ্যমে তটভূমির মৎস্য চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলবে। মায়ার্স প্রক্ষেপ করেছেন যে সমুদ্রতল বৃদ্ধি সরাসরি বাংলাদেশে ২৬০ লক্ষ, মিশরে ১২০ লক্ষ, চিনে ৭৩০ লক্ষ, ভারতে ২০০ লক্ষ এবং পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে ৩১০ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করবে। শতকের মাঝামাঝি বহু ছোট দ্বীপ যেমন টুভালু এবং মার্শাল দ্বীপ ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হবে এমনকি জলমগ্ন হয়ে যেতেও পারে।
চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলি যেমন জোরদার হওয়া ঘূর্ণিঝড়, ঝড়, তাপতরঙ্গ এবং এল নিনো নকশার পরিবর্তন বিপুল জনসংখ্যাকে কষ্ট দিতে পারে। বিগত দশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যা তিনগুণ হয়ে কুড়ি কোটিতে দাঁড়িয়েছে। মৌসুমী বায়ু যা ভারতীয় উপমহাদেশের ৭০ শতাংশ বৃষ্টিপাতের জন্য দায়ী ভীষণভাবে পরিবর্তিত হতে পারে যার সম্ভাব্য ফল অননুমাণিত হতে পারে যেমন কিছু সময় বর্ধিত খরা এবং অন্য সময় বৃষ্টি। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষা ভারতীয় উপমহাদেশকে আক্রমন করেছিল যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রভাবিত ও অপসারিত হয়েছিল। নিচু বদ্বীপের মত অবস্থান হওয়ার জন্য বাংলাদেশ নাটকীয় ভাবে ভুক্তভোগী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির অন্যতম হয়ে থাকবে। জুলাই মাসের বন্যা বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী জেলাকে এবং ১০ লক্ষের বেশী মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। সেই মাসে এই দেশে গড় বৃষ্টিপাতের দ্বিগুন বেশী বৃষ্টি হয়েছিল ও তার সাথে উত্তর ভারতের কুল ছাপিয়ে যাওয়া নদীগুলি বৃষ্টির জল বহন করে এনেছিল।
আগামী শতকে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এর প্রত্যেকটি সমস্যার পুনর্মুল্যায়ান করা প্রয়োজন। নরমান মায়ার্স অনুমান করেছেন যে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সমুদ্রতল বৃদ্ধি প্রায় ১৬ কোটি মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। খরা এবং অন্যান্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও ৫ কোটি মানুষ পরিবেশগত উদ্বাস্তু হবে।
এই বিষয়ে কর্মরত অনেক পন্ডিত ও সক্রিয় অংশগ্রহনকারী ব্যক্তি পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের আইনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করছেন। মলি কনিস্বি আর আন্দ্রু সিমস্ নামক দুজন ব্রিটিশ লেখক যারা পরিবেশের বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, জেনেভা সম্মেলনে বা নতুন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বীকৃতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, যাতে "নিজ সরকারের কাজ অপেক্ষা পৃথক এবং স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে"। স্বীকৃতির পর রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি কমিসন গঠিত হবে যা সরাসরি নিরাপত্তা পরিষদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। যে সমস্ত রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে বৃহৎ দূষণকারী তারা তাদের "পরিবেশগত ঋণ" স্বীকার করে নেবে এবং উন্নতিশীল দেশগুলির, যারা এই দুষনের ফল ভোগ করে, দায়িত্ব কাঁধে নেবে। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যানস বগার্দিও রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন কিন্তু তিনি একটি পৃথক কনভেনশন বা চুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন যাতে প্রথাগত উদ্বাস্তুদের সুরক্ষার ব্যাপারটা হালকা না হয়ে যায়। উপরন্তু আমেরিকার অগ্রগতির জন্য কেন্দ্র বর্তমান অভিবাসন আইনে ভবিষ্যত জলবায়ুগত উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে সমাধানের জন্য কংগ্রেসকে চাপ দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা কমানোর জন্য বিশ্বের দেশগুলিকে তাদের গ্রিনহাউস নির্গমনের মাত্রা নাটকীয় ভাবে কমাতে হবে, গ্রিনহাউস বন্ধুসুলভ শক্তিকে পোষণ করার চেষ্টা বাড়াতে হবে এবং সহনীয় উন্নতি প্রকল্পে নিবেশ করতে হবে। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বের ব্যাপারে বহুব্যাপী ঐকমত আছে দাবি করে কনিস্বি এবং সিমস বলেছেন যে, যে সব দেশ তাদের জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ভাগ কমাতে ব্যর্থ তারা "ইচ্ছাপূর্বক এই ব্যবহার দেখাচ্ছে"। তারা বিতর্ক উত্থাপন করেছেন যে আন্তর্জাতিক আইনি ভাষায় এটা পরিবেশগত হয়রানির পর্যায়ে পড়ে।
মায়ার্স সতর্ক করেছেন যে ক্রমবর্ধমান উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধান করতে হলে বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের আঞ্চলিক পর্যায়ে পরিবেশগত সমস্যার মূল কারণ বিবেচনা করতে হবে। তিনি সওয়াল করেছেন যে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ব মরুকরণ বিরোধী প্রয়াসে প্রতি বছর ২২০ কোটি ডলার খরচ করা উচিত, যা মরুকরণ জনিত ক্ষতির অর্ধাংশ। বনাচ্ছাদন পুনরুদ্ধার করা মরুকরনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি বাস্তব পদক্ষেপ যার উদাহরণ নোবেলজয়ী ওয়ান্গারী মাথাই কেনিয়ার সবুজ বন্ধনী আন্দোলনের মধ্যে দিয়েছেন। বৃক্ষ আশ্রয় বন্ধনী সৃষ্টি করে, মাটির জলীয় বাষ্প রক্ষায় সাহায্য করে এবং মাটির জলীয় বাষ্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এটা সম্ভাব্য যে পরিবেশগত উদ্বাস্তুদের নিয়ে গবেষণা এবং নীতি নির্দিষ্টকরণ বাড়তেই থাকবে যদি নরমান মেয়রের জলবায়ু সংস্থায় করা এবং ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত যুগান্তকারী গবেষনা অনুসারে এই সব মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ১৯৯২ সালে যখন গবেষণাটি আরম্ভ হয় তখন এই শব্দটি কদাচ ব্যবহার হত। এখন এটি সম্বাদমাধ্যম এবং নীতি নির্ধারকরা প্রায়ই ব্যবহার করেন যদিও এর সংজ্ঞা সম্পর্কে সার্বিক ঐকমত নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রতল বৃদ্ধি, জনসংখ্যার চাপ এবং ভূমির অবনতি প্রভৃতি মানুষের বাসভূমির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এটা সম্ভাব্য যে এই প্রতিদ্বন্দিতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের, এই সব চাপে বেপরোওয়া ও ছিন্নমূল মানুষদের এবং যে সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা পালিয়ে যাচ্ছে তাদের, ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। www.climate.org এর এই বিভাগ এই সমস্যার মোকাবিলা করার বিকাশমান প্রচেস্টাগুলিকে কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে ধরার প্রয়াস চালাবে।
Translated into Bengali by Saheli Nath
See also: Policy Responses to Climate Refugees: What Are Governments Doing? by Max Jerneck, March 2009
Brown, Lester R. Plan B 2.0: Rescuing a Planet under Stress and a Civilization in Trouble, 2006.
Conisbee, Molly and Andrew Simms. Environmental Refugees: The Case for Recognition. New Economics Foundation, 2003.
Cooperative for Assistance and Relief Everywhere: In Search of Shelter: Mapping the Effects of Climate Change on Human Migration and Displacement (May 2009)
DiLorenzo, Sarah. "Climate Change Is Creating New Refugees Who Deserve U.N. Protection, Says U.N. Professor." Associated Press, May 17 2007.
Friends of the Earth. "A Citizen's Guide to Climate Refugees."
IPCC Working Group II Report, Summary for Policymakers: Impacts, adaptation and vulnerability (Intergovernmental Panel on Climate Change, 2007)
Keane, David: The Environmental Causes and Consequences of Migration: A Search for the Meaning of "Environmental Refugees" (Georgetown International Environmental Law Review, 2004)
Manik, Julfikar Ali and Somini Sengupta. "South Asia Grapples with Results of Flooding." The New York Times, August 4 2007.
Marks, Kathy : S.O.S.: Pacific islanders battle to save what is left of their country from rising seas (The Independent, 2007)
Myers, Norman. Environmental Exodus: An Emergent Crisis in the Global Arena. [PDF] Climate Institute, 1995.
Myers, Norman: Environmental Refugees: An Emergent Security Issue (2005)
Norwegian Refugee Council: Future Floods of Refugees: A Comment on Climate Change, Conflict and Forced Migration (Norwegian Refugee Council, 2008).
Sachs, Jeffrey: Climate Change Refugees. (Scientific American, 2007)
Simms: Unnatural Disasters, Special Report (The Guardian, 2003)
Stern, Nicholas: The Economics of Climate Change (2006)
UNHCR: The State of the World's Refugees: Human Displacement in the New Millennium. (2006)
|
Join the Climate Institute e-news mailing list: |
© 2007 - 2010 Climate Institute All Rights Reserved |
900 17th St. NW, Suite 700, Washington, DC 20006 Phone: +1-202-552-4723 Fax: +1-202-737-6410 info@climate.org |